নেতাজী সুভাষ বসু এক মৃত্যুঞ্জয়ী রহস্যাবৃত বীর

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের সবচেয়ে বড় বিপ্লবী বলা হয় তাকে। তিনি ছিলেন কংগ্রেসের সভাপতি। মহাত্মা গান্ধীর সাথে আদর্শিক মিল না থাকায় এবং নেহেরুর সাথে সম্পর্ক খারাপ হওয়ায় তিনি কংগ্রেস থেকে পদত্যাগ করে ফরোয়ার্ড ব্লক নামে একটি রাজনৈতিক দল গঠন করেন। তিনি গান্ধীর অহিংসা আন্দোলনের বিরোধী ছিলেন। সুভাষ বোসের বিশ্বাস ছিল বিদ্রোহ, বিপ্লব আর রক্ত ছাড়া স্বাধীনতা আনা যায় না। স্বাধীনতা সংগ্রাম নিয়ে তার এক বিখ্যাত উক্তি ছিল “তুম মুঝ হে খুন দো ম্যায় তুম হে আজাদি দুংগা”।  নেতাজী সুভাষ বোস অনেক মেধাবী ছিলেন তিনি ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় কোলকাতা বোর্ডে ১ম হন। তিনি কোলকাতার স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে দর্শনে বি.এ. এবং পরে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন করেন। তিনি সর্বভারতীয় সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় ৪র্থ হন কিন্তু নিয়োগ পত্র পেয়েও তিনি যোগদান করেন নাই। তিনি ক্রান্তিকারি, আতোতায়ীদের মাধ্যমে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়তে থাকেন। ক্ষুদিরাম, ভগত সিং, প্রীতিলতা, অরবিন্দ সিং, আসফাক উল্লা খান, চন্দ্রশেখর আজাদ, আজমল খা প্রমুখ বিদ্রোহীরা সুভাষ বোসের স্নেহধন্য ছিলেন। ২য় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে ব্রিটিশরা কংগ্রেস আর মুসলিম লীগের সাহায্য প্রার্থণা করে যাতে ভারতীয়রা যুদ্ধে ব্রিটিশদের পক্ষে অংশ নেয়। গান্ধী, নেহেরু আর জিন্নাহ ব্রিটিশদের অনেকটা সন্তুষ্ট রাখার মাধ্যমেই কোন রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ ছাড়া স্বাধীনতা নেওয়ার বেপারে আশাবাদী ছিলেন। গান্ধী সুভাষ বোস কে ডেকে পাঠান তিনি তাকে ব্রিটিশদের পক্ষে থাকতে অনুরোধ করেন। কিন্তু বোস মহাত্মা গান্ধীর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। ব্রিটিশ রাজ তাকে গৃহবন্দি করে রাখে। হঠাৎ তিনি একদিন বাড়ি থেকে পালিয়ে যান। সুভাষ বোস পেশোয়ার, কাবুল ও মস্কো হয়ে ভিয়েনা যান। সেখান থেকে তিনি জার্মনিতে গিয়ে হিটলারের সাথে দেখা করেন। এসময় তিনি বার্লিনে দীর্ধদিন অবস্থান করেন ও প্রশিক্ষণ নেন। বোস জার্মানিতে অবস্থান কালে দুইটি বই লিখেন ইন্ডিয়ান পিলগ্রিম এবং ইন্ডিয়াস স্ট্রাগাল ফর ফ্রিডম। সেই সময়ে তার পাণ্ডুলিপি টাইপ করার জন্যে এক অস্ট্রিয়ান মহিলা এমিলি শেংকেল তাকে সাহায্য করেন যিনি পরবর্তীকালে তার সচিবও হন। এই এমিলি শেংকেলের সঙ্গেই পরবর্তীকালে তার প্রণয় ও পরিণয়। এরপর সুভাষ বোস জার্মানি থেকে জাপান চলে আসেন। এখানে জাপান সম্রাট হিরোহিতের সাথে দেখা করেন। সুভাষ বোস এরপর আরাকানে চলে আসেন এবং ভারতীয় সেনাদের একত্রিত করে আজাদ হিন্দ ফৌজ গঠন করেন। সুভাষ বোস জাপানী ও ন্যাৎসি বাহিনীর সাথে হাত মিলিয়ে প্রায় পঞ্চাশ হাজার সেনা নিয়ে মায়ানমার, জাপান, সিংগাপুরে ব্রিটিশ ও আমেরিকান মিত্র বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়তে থাকেন। ১৯৪৩ সালে তিনি আজাদ হিন্দ অস্থায়ী নির্বাসিত সরকার গঠন করেন আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে। যাতে জাতির পিতা হিসেবে গান্ধীকে এবং দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিজের নাম ঘোষণা করেন। এই সরকারকে হিটলারে জার্মানি, মুসোলিনির ইতালি, জাপান, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম সহ মোট ১১টি দেশ স্বীকৃতি দেয়। এই সরকারের নিজস্ব সেনাবাহিনী ছিল, নিজস্ব ব্যাংক, মুদ্রা ও ডাকটিকিট ছিল। সুভাষচন্দ্র বোস প্রথম ভারতের জাতীয় সংগীত হিসেবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের “জণ গণ মন” গানটিকে নির্বাচিত করেন। গানটি হিন্দিতে অনুবাদ করেন আজাদ হিন্দ ফৌজের দুই মুসলিম সেনা সদস্য নাম মুমতাজ হুসেন এবং আবিদ হাসান সাফরানি। গানটির লিরিক্স বর্তমান ভারতের জাতীয় সংগীতের লিরিক্সের চেয়ে কিছুটা ভিন্ন। এই গানটির নাম হল “সাব সুখ চেন” আর বর্তমান ভারতের জাতীয় সংগীতের নাম হল “জণ গণ মন” দুইটিই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একই কবিতা থেকে অনুবাদ করা। ১৯৪৫ সালে  হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে নিউক্লিয়ার বোমা ফেলা হলে জাপান আত্মসমর্পণ করে ৷ ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিল সুভাষচন্দ্র বোসকে ২য় বিশ্বযুদ্ধের যুদ্ধাপরাধী হিসেবে ঘোষণা করে। ২য় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলে ব্রিটিশরা ডিভাইড এন্ড রুল গেমের মাধ্যমে এক প্রকার রক্তক্ষয়ী পার্টিশনের মাধ্যমে ভারত ও পাকিস্তানকে স্বাধীনতা দেয়। গান্ধী যে রক্তবিহীন স্বাধীনতা চেয়েছিলেন শেষ পর্যন্ত তা রক্তপাতের মাধ্যমে অর্জিত হয়। কিন্তু যে রক্ত ফিরিঙ্গিদের হওয়ার কথা ছিল সেটা না হয়ে শুধু মাত্র গান্ধী, নেহেরু ও জিন্নার দূরদর্শীতার অভাবে সে রক্তপাত হয়েছিল ভাই ভাইয়ের রক্ত, হিন্দু- মুসলমানের রক্ত। ব্রিটিশ ও আমেরিকান ইতিহাসবিদরা আজকাল বলে থাকেন ভারতের স্বাধীনতার পিছনে আসলে গান্ধী, নেহেরু ও জিন্নাহ সহ কোন ভারতীয় নেতার অবদান ছিল না। ভারতের স্বাধীনতার পিছনে সবচেয়ে বড় অবদান ছিল হিটলারের। শুধুমাত্র হিটলারের ২য় বিশ্বযুদ্ধে অবস্থানের কারণে ব্রিটিশ অর্থনীতিতে ধস নামে যার কারণে ব্রিটেন তার উপনিবেশ গুলোকে স্বাধীনতা দিতে বাধ্য হয়। বরং গান্ধীর অহিংসা নীতি এবং নেহেরু আর জিন্নাহর ক্ষমতার লোভ ভারতকে সিভিল যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেয়। সেই দিক থেক বলা যায় সুভাষ বোসের স্ট্রাটেজিই ঠিক ছিল। যাই হোক আসল কথায় আসি, মহাত্মা গান্ধী দেশ ভাগের প্রচন্ড বিরোধী ছিলেন কিন্তু কথিত আছে যে জিন্নাহ ও নেহেরু দুই জনই দেশ ভাগ মনে প্রাণে চাইতেন। গান্ধী তখন সুভাষ বোসকে ফিরিয়ে আনতে চেয়েছিলেন কিন্তু ব্রিটিশদের সাথে কংগ্রেসের চুক্তি ছিল বোস দেশে ফিরলে যাতে তাকে ব্রিটিশদের হাতে তুলে দেওয়া হয়৷ মিত্রবাহিনী বলেছিল সুভাষ বোসকে তারা অন্যান্য নাৎসিদের মতই ট্রায়ালে মৃত্যুদন্ড দিবে। বোস এই কথা আগেই জানতেন তাই তিনি প্লেন ক্রাশের একটা সাজানো নাটক সাজান। যেটাতে তাইওয়ানের তাইপে বিমানবন্দরে প্লেন ক্রাশে তার মৃত্যু হয়েছে বলে পুরো বিশ্ব জানতে পারে। এভাবেই তৈরি হয় একটা কন্সপিরিউরিসি থিউরি যা এখন পর্যন্ত বলবৎ আছে। এভাবেই নেতাজি সুভাষচন্দ্র বোস চিরদিনের জন্য অজ্ঞাত হয়ে যান। জাপান মিলিটারি তাকে এই প্লেন দূর্ঘটনার নাটক সাজাতে সাহায্য করে। বোস জীবিত আছেন এই কথা একমাত্র জানতেন গান্ধী। কিন্তু উগ্র হিন্দুবাদীদের হাতে ১৯৪৮ সালে মহাত্মা গান্ধী নিহত হলে সুভাষ বোস বেচে আছেন এই সত্য চিরদিনের জন্য হারিয়ে যায়৷ পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত রাশিয়া, আফগানিস্তান, তিব্বত এবং ভারতের বিভিন্ন খানে তাকে ছদ্মবেশে ঘুরে বেড়াতে দেখা গেছে এমন খবর আসতে শুরু করে৷ বোসের মৃত্যু নিয়ে ৩ বার কমিশন গঠন হয় প্রতিবার জাপান টোকিওর রেইনকোজি মন্দিরে সুভাষচন্দ্র বোসের যে অস্থি ভস্ম আছে তার সাথে ডি.এন.এ. মিলিয়ে দেখা হয় কিন্ত প্রতিবারই টেস্টের রেজাল্ট নেগেটিভ আসে। কিন্তু তার পরও ভারত সরকার বিশেষত কংগ্রেস নিজেদের স্থান হারানোর ভয় এবং আন্তর্জাতিক চাপে কোন এক অজ্ঞাত কারণে কমিশনের রিপোর্টকে অস্বীকার করে গেছে এবং যাচ্ছে। সুভাষ বোস পুরা ভারতে গান্ধী, নেহেরু ও জিন্নার চেয়ে অনেক বেশী জনপ্রিয় ছিল। তিনি কংগ্রেস সভাপতি নির্বাচনে অংশ নিয়ে মোট দুই বার গান্ধীর মনোনীত প্রার্থীসহ নেহেরুকে বিপুল ব্যবধানে হারিয়ে দেন। বলা হয়ে থাকে অনেক মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায়ও তিনি জিন্নাহ চেয়ে জনপ্রিয় ছিলেন। বোসের সংগঠিত আজাদ হিন্দ ফৌজের একটা বৃহৎ অংশ বাঙ্গালী মুসলিমদের দ্বারা গঠিত ছিল। তাই সুভাষ বোসের দেশে ফেরা নিয়ে তাদের মধ্যেও একটা ইন-সিকিউরিটি ছিল। তাই অনেকেই চাইতেন না যাতে বোস দেশে ফিরুক কিংবা তার মৃত্যু নিয়ে কন্সপিউরিসি থিউরিটা খোলাসা হোক। ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত জহরলাল নেহেরু নেতাজী সুভাষ বোসের পরিবারের উপড় এজেন্ট দিয়ে কড়া নজরদারি রাখেন। ভারতের কোন সরকার আজ অবধি নেতাজীর মৃত্যুর তদন্ত রিপোর্ট কখনো জন সম্মূক্ষে আনার সাহস দেখায় নাই। কিন্তু সাবেক সোভিয়েত কে.জি.এফ. এজেন্টদের বিভিন্ন নথিতে বিভিন্ন সময়ে তাকে রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থী হিসেবে দেখানো হয়েছে ১৯৬০ সাল পর্যন্ত। অনেকে এই দাবী করেন যেহেতু সে ২য় বিশ্বযুদ্ধে মিত্র বাহিনীর বিরুদ্ধে ছিল তাই রাশিয়াতে স্ট্যালিন সরকার তাকে মেরে ফেলে। ভারতে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে স্বাধীনতার স্থপতি হিসেবে গান্ধী, নেহেরুর সাথে ইদানীং সুভাষচন্দ্র বোসের ছবি লাগাতে দেখা যায়। কিন্তু তাদের প্রতিটি সরকার এবং প্রতিটি রাজনৈতিক দল নেতাজী সুভাষ বোসের মৃত্যু এবং তার দেশে ফেরার কাহিনির বেপারে ইন-সিকিউর ফিল করে। কারণ বোস যদি ফিরে আসত তাহলে ইতিহাস আলাদা হত। সে ইচ্ছা করেই ফিরে আসে নাই কারণ ভিক্ষা ও সমঝোতায় নেওয়া স্বাধীনতা এবং বিনা রক্তপাতে ব্রিটিশদের তিনি তাড়াতে চান নি। সুভাষ বোসের ব্যাক্তিত্বের দ্বারা প্রাভাবিত হয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের মত কবিরাও। আজকাল  অধিকাংশ  ভারতীয় লোকজন মনে করেন মহাত্মা গান্ধী নন বরং নেতাজী সুভাষচন্দ্র বোসই তাদের জাতির পিতা। যদিও ভারতের প্রতিটি সরকার পাঠ্যপুস্তকে সুভাষ বোসকে একজন বিপ্লবী হিসেবেই তুলে ধরে। কিন্তু মুক্ত ইন্টারনেটের এই যুগে একজন যুবকে  সুভাষ কে? প্রশ্ন করলে সে একটাই উত্তর দেয়ঃ

অহিংসার মিথ্যে আশ্বাস দিয়ে গোলামির নাম সুভাষ নয়

বরং অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা তুলে অশান্তি করার নামই সুভাষ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top