মহাদেশীয় সরণ (Continental Drift)

১৪৯২ সনের আগ পর্যন্ত আমাদের বর্তমান পৃথিবীর এক তৃতীয়াংশ ভূমি সভ্য সমাজের অজানা ছিল। ক্রিস্টোফার কলম্বাস আমেরিকা আবিষ্কারের পূর্বে ইউরোপীয়ানরা ভাবত আটলান্টিকের ওপাড়ে কিছুই নেই। তত্কালীন ক্যাথলিক চার্চের ব্যক্তিরা ধারণা পোষন করতেন আটলান্টিকের ওপাড়ে নরকের অবস্থান। গত এপ্রিল মাসের ২৫ তারিখে যখন নেপালে ৭.৮ মাত্রার ভূমিকম্প হয়ে গেল তখন আমাদের বুয়েটের মেকানিক্যাল ’০৯ ব্যাচের সবাই কক্সবাজারের ইনানী বিচে। ভূমিকম্প ইদানিং খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ গত মাসে নেপালে যে ভূকম্পন হল তাতে নিহতের সংখ্যা প্রায় ৭৫০০ ছাড়িয়েছে। তবে এখানে আমি যে বিষয়টা উপস্থাপন করব তা অবশ্যই ভূমিকম্পের মত এত গম্ভীর বিষয় না। আমি একটা গল্প বলতে যাচ্ছি। এই গল্পটা আমাদের সবার, সকল দেশের, সকল মহাদেশের, গল্পটা হিমালয় পর্বতমালারও। গল্পটার নাম দিলাম “মহাদেশীয় সরণ”।

মানচিত্র আমার খুব পছন্দের একটা জিনিস। ছোটবেলায় গোল মানচিত্র ঘুরিয়ে দেশের ক্যাপিটাল বের করা দ্রুত সময়ে এই রকম একটা খেলা খেলতাম। ওয়ার্ল্ড ম্যাপের দিকের একটু খুব করে তাকালে দেখা যায় যে, যেন পৃথিবীর মহাদেশগুলো কেমন যেন অনেকটা Jigsaw Puzzle এর মত। বিশেষ করে ইউরোপ ও আফ্রিকার পশ্চিম অংশ কেন জানি উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার পূর্ব অংশের সাথে খাপে খাপে মিলে যায়। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হল আমাদের বাংলাদেশ সহ পুরো ভারতীয় উপমহাদেশ এক সময় এন্টার্কটিকা ও আফ্রিকার মহাদেশের সাথে যুক্ত থেকে আস্ট্রেলিয়ার সাথে সংযুক্ত ছিল। এই বিষয়গুলো আমাদের অগোচরে ছিল যেদিন পর্যন্ত না আলফ্রেড ওয়েগনার continental drift theory টা প্রস্তাব করেন।

১৯১২ সনে ওয়েগনার প্রথম প্রস্তাব করেন “earth’s continents are moving relative to each other.” আলফ্রেড ওয়েগনার ছিলেন একজন জার্মান আবহাওয়াবিদ (meteorologist) . তিনিও প্রথম আফ্রিকার পশ্চিম উপকূল ও দক্ষিণ আমেরিকার পূর্ব উপকূলের এই সাদৃশ্য দেখে আশ্চর্য হন। কিন্তু তিনি থেমে থাকেন নি বরং এর কারণ উদঘাটনে সচেষ্ট হন। তিনি তার পুরো জীবন এই তত্ত্ব প্রমাণের কাজে ব্যয় করেছিলেন। যেহেতু তার এই তত্ত্ব তৎকালীন ভূতত্ত্ব, পরিবেশবিদ্যা, প্রাণীভূতত্ত্বের গোড়া নড়বড়ে করে দিয়েছিল তাই তৎকালীন বিজ্ঞানীরা ওয়েগনারের এই প্রকল্পকে স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে পারেন নাই। ১৯৬০ সাল পর্যন্ত ডারউইনের বিবর্তনবাদের মতই বিজ্ঞ সমাজের কাছে এই তত্ত্ব সুপ্রতিষ্ঠিত হতে পারে নাই। যদিও ওয়েগনার মারা যাওয়ার আগে তার এই তত্ত্বটি সন্দেহাতীত ভাবে প্রমাণ করে গিয়েছিলেন। ইদানিং Ice age-4 মুভিটিতে continental drift নিয়ে বেশ কয়েকটি দৃশ্যপট তুলে ধরা হয়েছে। যাই হোক আসল কথায় আসি।

ওয়েগনার তার মুল তত্ত্বে বলেন যে আজ থেকে প্রায় ২৫০ মিলিয়ান বছর আগে বর্তমান পৃথিবীর ৭টি মহাদেশ এক সাথে সংযুক্ত ছিল। তিনি এই একমাত্র মহাদেশীয় ভূখন্ডটির নাম দেন pangaea । শব্দটির গ্রীক এর অর্থ হল entire earth. তিনি এই তত্ত্বের প্রমাণস্বরুপ প্রথমে ৪ টি যুক্তি পেশ করেন।

এক, যেহেতু আফ্রিকার পশ্চিম উপকূল ও দক্ষিণ আমেরিকার পূর্ব উপকূল এবং ভারতের পশ্চিম উপকূল ও আফ্রিকার পূর্ব উপকূল পরস্পরের সাথে খাপে খাপে মিলে যায় সুতরাং এটা কোন coincidence হতে পারে না। (apparent fits of continents)

দুই, ওয়েগনার তার দ্বিতীয় যুক্তি দেন fossils এবং pre-historic life এর উপর। মেসেসোরাস (mesosaurus) নামে এক সরীসৃপ বাস করত আজ থেকে ২৫০ মিলিয়ন বছর আগে যার জীবাশ্ম পাওয়া যায় আফ্রিকার পশ্চিম উপকুলে। ঠিক সেই সময় প্রাণীভূতত্ত্ববিদরা দক্ষিণ আমেরিকার পূর্ব উপকুলে একই ধরনের মেসেসোরাসের এর জীবাশ্ম খুঁজে পান। ওয়েগনার এর যুক্তি ছিল মেসেসোরাসরা আজ থেকে ২৫০ মিলিয়ন বছর পূর্বে এই দুটি অঞ্চলে বাস করত। যেহেতু মেসেসোরাসরা উড়তে পারে না। আর লোনা পানিতে এরা বাঁচতে পারে না আর বাঁচলেও এত বড় আটলান্টিক পাড়ি দেওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব না তাই এই সময়টায় নিশ্চয় মহাদশগুলো একত্রে যুক্ত ছিল। তিনি মেসেসোরাস ছাড়াও Cynognathus, lystrosaurus ও Glossopteris এইসব pre-historic life এর প্রাণীদের জীবাশ্ম নিয়ে গবেষণা করেও একই ধরনের ফলাফল পান। (fossils correlations)

তিন, ওয়েগনার এরপর পর্বত ও শিলা নিয়ে গবেষণা করে দেখতে পান উত্তর পূর্ব আমেরিকার পর্বতমালা ও উত্তর ইউরোপের পর্বতগুলোর মধ্যেও বেশ সাদৃশ্য রয়েছে। এই পর্বতগুলো একই ধরনের এবং একই বয়সের পাথর দ্বারা গঠিত। (Rock and Mountain Correlations)

চার, ওয়েগনার আফ্রিকার ও ব্রাজিলের বিটুমিনাস কয়লা এর মধ্যেও সাদৃশ্য খুঁজে পান। তিনি দেখান যে আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকাকে জোড়া দেওয়া হলে ব্রাজিলের আমাজান ও আফ্রিকার বিস্তৃর্ন জঙ্গল একই লাইনে এসে যায়। ২৫০ মিলিয়ন বছর পূর্বে এই দুই রেইন ফরেস্ট একত্রে সংযুক্ত ছিল। (paleoclimate data)

কিছুদিন আগে নেপালে যে ভূমিকম্প হল তা মুলত ইউরেশিয়ান টেকটনিক প্লেট ও ইন্ডিয়ান টেকটোনিক প্লেটের সরণের ফলে। টেকটোনিক প্লেট তত্ত্ব ও উপমহাদেশীয় সরণ তত্ত্ব অনুযায়ী ইন্ডিয়ান প্লেটটি প্রায় ২২৫ মিলিয়ন বছর পূর্বে আফ্রিকা ও এন্টার্কটিকা মহাদেশের সাথে যুক্ত ছিলো। ইন্ডিয়ান প্লেটটি এদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে মিলিয়ন মিলিয়ন বছর ধরে ইউরেশীয়ান প্লেটের দিকে আগাতে থাকে। এবং এই দুটি প্লেট কোন এক সময় প্রবল বেগে পরস্পরের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হলে হিমালয় পর্বতমালা গঠিত হয়। এই অপরুপ সৌন্দর্য্যের পিছনে একটা ভয়ংকর দূর্ঘটনা লুকিয়ে আছে। মাউন্ট এভারেস্ট আর K2 এর উৎপত্তি এভাবেই। আশ্চর্যের বিষয় হল গ্লোবাল ওয়ার্মিং এর কারণে যেখানে ধারণা ছিল পর্বতগুলোর উচ্চতা কমে যাবে সেখানে বিগত কয়েক দশকে হিমালয়ের উচ্চতা বেড়ে গেছে। কারণ টেকটোনিক প্লেট গুলো এখনো মাঝেমাঝে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়ে একে অপরকে খুব ধীরে ধীরে গ্রাস করে যাচ্ছে। আসলে ভূমিকম্পন প্রবণ অঞ্চলগুলো এই টেকটোনিক প্লেট সংযোগস্থল বরাবর হয়ে থাকে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top