মানব জিনগত সমস্যাঃ সুগার ক্রেভিং

স্থুলতা বর্তমান মানব সমাজের একটা সাধারণ প্রচলিত সমস্যা। আর এর থেকেই বেড়ে যায় হার্ট অ্যাটাক, ব্রেন স্ট্রোক এবং ডায়বেটিস এর মত অন্যান্য বড় সমস্যার সম্ভাবনা। কিন্তু মানব সভ্যতার প্রথম দিকের মানুষদের এই রকম শারীরিক স্থুলতা জনিত সমস্যা ছিল না। তারা লম্বায় ছিল দীর্ঘকার এবং মাথা ছিল ছোট। ধীরে ধীরে মানবজাতি তাদের শারীরিক কসরত কমিয়ে আনে আর বুদ্ধির বিকাশ ঘটাতে থাকে। ফলে হোমো-সেপিয়েন্সদের শারীরিক সক্ষমতা হ্রাস পায়, দীর্ঘাকায় মানুষ দিন দিন খর্বাকার হতে থাকে আর মস্তিষ্কের আকৃতি অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি প্রাপ্ত হয়। বর্তমানে মানুষের ব্রেনের আকার ও ওজন প্রথম দিকের হোম সেপিয়েন্সরদের তুলনায় অনেক বেশী। ফলশ্রুতিতে যেহেতু হার্টের আকার বা কার্যক্ষমতা তেমন একটা বাড়ে নাই, এই বিশাল মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহ করতে গিয়ে অন্যান্য অঙ্গ পতঙ্গের (হাত-পা) আকার ও কার্যক্ষমতা দিন দিন কমে গিয়েছে। এবং এখনো মানুষের এই পরিবর্তন হচ্ছে খুবই ধীর গতিতে। প্রথম দিকের হোমো-সেপিয়েন্সরা গাছের ফলমূল আর পশু শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করত। পরবর্তীতে পশু শিকারের পরিবর্তে পশু-পাখিদের পোষ মানাতে সক্ষম হয় মানুষ। আর এভাবেই বিনা শারিরীক কসর‍ত ছাড়াই প্রয়োজনীয় আমিষ চাহিদা মেটাতে সক্ষম হয় মানুষ। এবার আসি কার্বোহাইড্রেট প্রসঙ্গে। কার্বোহাইড্রেট মুলতঃ দুই প্রকারঃ সুগার আর নন সুগার। সুগার হল মিষ্টিজাতীয় এরা আবার দুই প্রকারঃ মনো স্যাকারাইড, ডাই স্যাকারাইড। আর সন সুগার কার্বোহাইড্রেট হল পলি স্যাকারাইড। মনো স্যাকারাইড হলঃ গ্লুকোজ, ফ্রুক্টোজ, গ্যালাক্টোজ। আর ডাইস্যাকারাইড হলঃ সুক্রোজ = গ্লুকোজ+ ফ্রুক্টোজ, ল্যাক্টোজ = গ্লুকোজ + গ্যালাক্টোজ, মাল্টোজ= গ্লুকোজ + গ্লুকোজ। নন সুগার-পলি স্যাকারাইড (গ্লুকোজের চেইন) যেমনঃ স্টার্চ, সেলুলোজ। গ্লুকোজ খুবই দরকারি একটা উপাদান মুলত একে ব্রেইনের ফুয়েল বলা হয়। কিন্তু এই গ্লুকোজ যখন মানুষ বেশী খেয়ে ফেলে তখনি হয় বিপত্তি। ডাই-স্যাকারাইডদের মধ্যে সবচেয়ে ক্ষতিকারক সুক্রোজ। তবে সুক্রোজের মধ্যে যদি ফ্রুক্টোজ, গ্লুকোজের চেয়ে বেশি থাকে তবে সেগুলিকে গুড সুইট বা ন্যাচারাল সুগার ধরা হয় যা তুলনামুলক কম ক্ষতিকর। যেমনঃ ফলের মিষ্টি, মধু। তবে কার্বোহাইড্রেট যেই ভাবেই খাওয়া হোক না কেন অতিরিক্ত সবই শরীরের জন্য অপকারী কারণ মানুষের ইনসুলিন নিঃসরণের একটা ক্ষমতা থাকে। আর যখন ইনসুলিনের মাত্রার চেয়ে অনেক বেশী কার্বোহাইড্রেট মানুষ খেয়ে ফেলে তখনি তৈরি হয় বিপত্তি। আর এখন কথা হল মানুষ বেশি লবণ খেলে আর খেতে চায় না। তেমনটি ঝাল, টক, তিতার বেলার প্রযোজ্য। কিন্তু মিষ্টি খাওয়ার সময় এমনটা মনে হয় অনেক পরে। যখন অনেক বেশি মিষ্টি/শর্করা খাওয়া হয়ে যায় তখন আমাদের মস্তিষ্ক জানান দেয় আর খাওয়ার দরকার নাই। এই জিনিসটার একটা নাম আছে একে বিজ্ঞানের ভাষায় বলে সুগার ক্রেভিং। ড্রাগ বা মাদকের মতই এটা একটা আসক্তি। বর্তমান বিজ্ঞান বলছে এই আসক্তি মাদকের চেয়ে ভয়ংকর। মানুষ যখন শর্করা বা মিষ্টি খায় তখন মস্তিষ্কে ডোপামিন নিঃসৃত হয় এবং মানুষ বুঝে উঠতে পারে না তার ইনটেক লিমিট। এবং এই আসক্তি মানুষের জন্ম থেকেই। একটি সদ্য জন্ম নেওয়া শিশুকে মিষ্টি খাওয়ালে সে খেতে চায় কিন্তু তিতা, টক বা ঝাল সে খেতে চায় না। মিষ্টি খাওয়ার এই প্রবণতা মানুষের ডিএনএতে আগে থেকেই কোড করা আছে। এবং এই কোডিং হয়েছে লক্ষ বছর আগে। এই কোডিং কিভাবে হল তার গল্পটা এইরকমঃ

আজ হতে প্রায় লক্ষ বছর আগে যখন মানুষ পশু-শিকার আর বনের ফলমূল খেয়ে বেঁচে থাকত তখন তাদের অনেক সংগ্রাম আর শারীরিক কসরত করে বেঁচে থাকতে হত। সেই সময় তারা কৃষিকাজও শেখে নাই। বেঁচে থাকার জন্য খাদ্যের যোগান অপ্রতুল না হলেও তা সংগ্রহ করা ছিল চ্যালেঞ্জিং এবং অনেক শারীরিক এনার্জি খরচ হত তাতে। তাই বেঁচে থাকার জন্য তার বনের সেই ফলমুল গুলোই খেত যা ছিল অনেক রসালো ও মিষ্টি। মিষ্টি খেতে সেই সময় মানুষের খুব একটা ভালো লাগত তা কিন্তু নয় বরং শুধু মাত্র বেঁচে থাকার তাহিদেই অধিক ক্যালরির মিষ্টি ফল গুলো তার খেত। কিন্তু শুধু ফল খেয়েই তাদের শর্করার চাহিদা মিটছিল না তাই তার ধীরে ধীরে বের করে ফেলে বাদাম, ভুট্টা, যব সহ অনেক ধরনের শস্য দানা। আগুনের ব্যবহার তখন কেবল শুরু হয়েছে তাই রান্না করার কাজে তারা খুব একটা উৎসাহী ছিল না সেই সময় মানুষেরা। তাই বেঁচে থাকার জন্য বনের সুমিষ্ট ফলমুল আর শস্যদানা ছিল তাদের প্রথম পছন্দ। এভাবেই হাজার হাজার বছর মানুষ অধিক ক্যালরির সুমিষ্ট ফলমুল আর শস্যদানা খেয়ে কাটিয়ে দিয়েছিল। আর এভাবেই হোমো সেপিয়েন্সের ডিএনএ তেও একটা বিশাল পরিবর্তন আসে যা আজও তাদের মিষ্টি খেতে উৎসাহ যোগায়। তাই আমরা যখন একটু বেশী মিষ্টি/শর্করা খেয়ে ফেলি দোষটা শুধুমাত্র আমাদের না, অনেকাংশেই আমাদের পূর্বপুরুষদেরও বটে!

কিন্তু সভ্যতার অনেক পরিবর্তন হয়েছে। এখন মানুষ আর গুহাবাসী না কিংবা নদীর ধারে বসবাসকারী কোন প্রজাতি না যারা বেঁচে থাকে বনের মিষ্টি ফলমুল কিংবা কৃষিকাজ করে উৎপাদিত বিভিন্ন শস্য দানা খেয়ে। এখন মানুষ এমন এক প্রজাতি যারা চার দেওয়ালের বিশাল বিশাল অট্টালিকায় থাকে, মোটরাইজড যানবাহনে চড়ে আর তাদের খাবারের জন্য তেমন আহামরি শারীরিক পরিশ্রমের দরকার পরে না। কিন্তু অন্যদিকে মানুষে খাদ্যতালিকায় যোগ হয়েছে বিভিন্ন হাই সুগারের প্রসেসড (অধিকাংশই মনোস্যাকারাইড বা ডাইস্যাকারাইড) ফুড যাতে কোন প্রকারের ফাইবার নাই শুধু পাকস্থলিতে যাওয়া মাত্রই তা ভেঙে গ্লুকোজে পরিণত হয় (গ্লুকোজে পরিণত করার জন্য পরিপাকতন্ত্রের নুন্যতম কোন সময় এবং শক্তির প্রয়োজন পরে না)। যার পরিণাম হলঃ রক্তে সুগারের মাত্রা বেড়ে যাওয়া, শরীরে চর্বি জমে স্থুলতা জনিত সমস্যার সৃষ্টি হওয়া। 

Craving sweet food

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top