তারাদের ঘড়ি (Clock of Stars)

প্রাচীনকালে যখন কোন ঘড়ি ছিল না আকাশ ছিল মানুষের ঘড়ি। পৃথিবী ২৪ ঘন্টায় একবার নিজ অক্ষে ঘুরে আর সাথে সাথে ৩৬৫ দিনে সূর্যের চারদিকে পরিভ্রমণ করে। এই ৩৬৫ দিনকে আবার ১২ মাসে ভাগ করা হয়। পৃথিবীর সব ক্যালেন্ডারেই বছরকে ১২ মাসে ভাগ করা হয় কিন্তু কেন এমনটি হল? বৃত্ত একটি গাণিতিক বিস্ময়। এটি এমন একটি আকার যার বিস্ময়ের কোন শেষ নাই। এর মধ্যে লুকিয়ে আছে অমূলদ সংখ্যা পাই। যার কোন সসীম দশমিক মান নাই। আর এই বৃত্তের ত্রিমাত্রিক রুপ গোলক। আমাদের পৃথিবী একটি গোলক। মহাবিশ্বকেও একটি গোলক হিসেবে চিন্তা করা হয়। যা প্রতিনিয়ত সম্প্রসারণশীল। আমাদের পৃথিবী আবার লম্বভাবে নিজ কক্ষপথে ঘুরে না। পৃথিবীর নিজ ঘূর্ণায়মান মধ্যরেখা হল তার মেরু রেখা বরাবর। যা পৃথিবীর নিজস্ব কক্ষপথের (Ecliptic Circle) উপর উলম্ব রেখা থেকে ২৩.৪৪ ডিগ্রী কোণে হেলানো।image

এইজন্যে উত্তর ও দক্ষিণ গোলার্ধে ঋতু পরিবর্তনের সাথে দিন রাত্রির সময়ের পার্থক্য হয়। ২১ জুন উত্তর গোলার্ধের সবচেয়ে বড় দিন আর ২১ ডিসেম্বর সবচেয়ে ছোট দিন। দক্ষিণ গোলার্ধে ঠিক তার উল্টো। আবার ২১ মার্চ ও ২৩ সেপ্টেম্বর উত্তর ও দক্ষিণ গোলার্ধে দিন -রাত্রি সমান। আসল বেপার হল ২১ ডিসেম্বর পৃথিবীর দক্ষিণ মেরু সূর্যের দিকে বেশী ঝুঁকে থাকে এবং সূর্য মকরক্রান্তি রেখার উপর লম্বভাবে আলো দেয় (Winter Solstice Northern)। এটাকে সূর্যের দক্ষিণায়নের শেষ দিন বা মকর সংক্রান্তি (Tropic of Capricorn) বলা হয়। ২১ ডিসেম্বর থেকে সূর্যের আলো দক্ষিণ গোলার্ধে আস্তে আস্তে কমতে থাকে এবং ২১ মার্চ সূর্য বিষুব রেখার উপর লম্ব ভাবে আপতিত হয় তখন সর্বত্র দিন রাত্রি সমান হয় (Vernal Equinox Northern)। আবার ২১ মার্চ থেকে পৃথিবীর উত্তর মেরু সূর্যের দিকে ঝুঁকতে শুরু করলে ২১ জুন গিয়ে উত্তর মেরু সূর্যের দিকে সবচেয়ে ঝুকে থাকে এই দিন সূর্য কর্কটক্রান্তি রেখার উপর লম্বভাবে আলো দেয় (Summer Solstice Northern)৷ একে উত্তরায়ণের শেষ দিন বা কর্কট সংক্রান্তি (Tropic of Cancer) বলে। ২১ জুনের পর থেকে সূর্য আবার উত্তর গোলার্ধ থেকে সরতে শুরু করে এবং আস্তে আস্তে ২৩ সেপ্টেম্বর সূর্য আবার বিষুবরেখার উপর লম্বভাবে আলো দেয় (Autumnal Equinox Northern) এবং দিন রাত্রি সমান হয়। এভাবে ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে ২১ ডিসেম্বর পৃথিবীর দক্ষিণ মেরু আবার সূর্যের দিকে ঝুকতে থাকে।image

image

আসলে আকাশের তারা বোঝার জন্য আমাদের পৃথিবীর আহ্নিক গতি ও বার্ষিক গতি বোঝা অনেক জরুরী। কারণ প্রাচীন কালের লোকেরা তারা দেখে সময় নির্ধারণ করত আর আমরা সময় দেখে তারাদের বোঝার চেষ্টা করব। খালি চোখে রাতের আকাশে আমরা দু’হাজারের মত তারা দেখতে পাই। এই তারকাদের নিয়ে প্রাচীনকাল থেকেই লোকেরা প্যাটার্ন তৈরি করত। গ্রিক, মিসরীয়, ভারতীয় ও আরবীয়রা এসব প্যাটার্নের মাধ্যমে সময়, ভাগ্য, দূর্যোগ, মহামারি এসবের গণনা করত। তারা আকাশের তারাদের বিভিন্ন ভাগে ভাগ করেছিল। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় সবার প্যাটার্ন গুলো একই, ছিল শুধু ভাষার তারতম্যের কারণে নাম গুলো ভিন্ন ছিল। বর্তমানে বিজ্ঞান সমস্ত আকাশকে (উত্তর ও দক্ষিণ গোলার্ধ) ৩৬০ ডিগ্রিকে) ৮৮ টি তারকামন্ডলে বা প্যাটার্নে ভাগ করেছে। এসব প্যাটার্নের নামের অন্ত নাই।

image

তবে এই ৮৮ টার মধ্যে ১২ টি প্যাটার্ন নিয়ে জ্যোতিষশাস্ত্র (Astrology) কাজ করে। এইগুলোকে রাশিচক্র বা Zodiac Circle বলে। বিজ্ঞানের ভাষায় যদি রাশি চক্র কাকে বলে ব্যাখ্যা করি তাহলে এভাবে বলা যায়। সূর্য যে কল্পিত রেখা বরাবর সারা বছর পৃথিবীর উপর লম্ব ভাবে আলো দেয় সেই রেখাকে Ecliptic line বলে। এটা আসলে অন্য কিছু না পৃথিবীর নিজস্ব কক্ষপথ বা Ecliptic Circle। এই Ecliptic line বছরের কোন সময় কখনো কর্কট ক্রান্তি রেখা, কখনো বিষুব রেখা বা কখনো মকর ক্রান্তি রেখার সমান্তরাল হয় এবং ঝতুর পরিবর্তন হয়। অথাৎ এই লাইন সারা বছরে দুইবার ২৩.৫ ডিগ্রি উত্তর অক্ষরেখা (কর্কট ক্রান্তি) থেকে ০ ডিগ্রি (বিষুব রেখা) হয়ে ২৩.৫ ডিগ্রি দক্ষিণ অক্ষরেখা বা মকর ক্রান্তি রেখার মাঝখানে বিভিন্ন অক্ষরেখা গুলির সমান্তরাল হয়। এই ecliptic line বরবার আকাশে মোট ১২টি তারকামন্ডলীর অবস্থান। (জ্যোর্তিবিজ্ঞান Astronomy মতে ১৩টি) সূর্য বছরের বিভিন্ন সময় এই ১২টি তারাকামন্ডলীর যেকোন একটিতে অবস্থা করে। শুধু তাই নয় রাতের আকাশে আমাদের সৌর জগতের সব গ্রহ যেমনঃ বুধ, শুক্র, পৃথিবী, মঙ্গল, শনি, বৃহঃ, ইউরেনাস, নেপচুন এবং চাঁদ সবাই এই লাইন বরাবর কোন না কোন তারকা মন্ডলীতে বছরের সব সময় অবস্থান করে। এই ১২ তারকামন্ডলী বা রাশির নামঃ ধনু (Sagittarius), মকর (Capricorn), কুম্ভ (Aquarius), মীন (Pisces), মেষ (Aries), বৃষ (Taurus), মিথুন (Gemini), কর্কট (Cancer), সিংহ (Leo), কন্যা (Virgo), তুলা (Libra), বৃশ্চিক (Scorpio)। বছরের কখন সূর্য কোনটিতে অবস্থান করে তার একটি প্রাচীন ধ্যান ধারণা আছে। জ্যোর্তিশাস্ত্র (Astrology) তে যে রাশিফল (Horoscope) গণনা করা হয় তা এই আপেক্ষিক Horoscopic ক্যালেন্ডার এর উপর ভিত্তি করে। এই Horoscopic ক্যালেন্ডার অনেকটা এই রকমঃ

ধনু (Sagittarius)- 23 Nov~ 20 Dec, মকর (Capricorn)- 21 Dec~20 Jan, কুম্ভ (Aquarius)- 21 Jan ~ 19 Feb, মীন (Pisces)- 20 Feb ~20 March, মেষ (Aries)- 21 March ~ 20 April, বৃষ (Taurus)- 21 April ~ 21 May, মিথুন (Gemini)- 22 May ~ 20 Jun, কর্কট (Cancer) – 21 June ~ 20 July, সিংহ (Leo) – 21 July~ 20 Aug, কন্যা (Virgo) – 21 Aug ~ 22 Sep, তুলা (Libra) – 23 Sep ~ Oct 23, বৃশ্চিক (Scorpio) – 24 Oct ~ 22 Nov

image

কর্কটক্রান্তি রেখা ও মকরক্রান্তি রেখার নাম কিভাবে এসেছে এই Horoscope ক্যালেন্ডারটি লক্ষ্য করলেই বুঝা যাবে। এই Horoscopic Chart হাজার বছর পুরানো। কিন্তু বর্তমান Astronomy এর বদলে এই চার্টের অনেক পরিবর্তন হয়েছে। বর্তমান Astronomy মতে Astrology ভিত্তিহীন। মানুষের ভাগ্যের উপর গ্রহ – নক্ষত্রের কোন প্রভাবকে Astronomy স্বীকার করে না। যদিও Astronomy (জ্যোর্তিবিজ্ঞান) ও Astrology (জ্যোর্তিশাস্ত্র) মধ্যে একটা গভীর সম্পর্ক রয়েছে। Astronomy মতে Ecliptic line এ তারকামন্ডলী মোট ১৩ টি যা পূর্বে ছিল ১২ টি। অপর তারকামন্ডলীটির নাম (Ophiuchus)।

image

আর বছর বছর এই তারকামন্ডলীগুলোর Ecliptic লাইনের মধ্যেই কিছুটা স্থান পরিবর্তন হয়। তাই বছরের কোন নির্দিষ্ট তারিখে সূর্য যে কোন নির্দিষ্ট তারাকামন্ডলী বা রাশিতে অবস্থান করবে তা ঠিক নয়। যেমন ২৫ ডিসেম্বর হল যিশু খ্রিস্টের জন্মদিন। আজ হতে ২০০০ বছর পূর্বে যখন তিনি জন্মেছিলেন তখন হয়ত সূর্য ঠিকই মকর (Capricorn) এ ছিল। কিন্ত আজ ২০২০ সালে কেউ ২৫ ডিসেম্বর জন্ম নিলে তার জাতক রাশি মকর বা Capricorn হবে না বরং ধনু বা Sagittarius হবে নাসার নতুন New Zodiac Circle by Date অনুযায়ী।

image

আসলে প্রতিনিয়তই তারকামন্ডলী গুলোর কিছুটা বিচ্যুতি ঘটে যা হয়ত বোঝা যায় না। একজন মানুষ জীবদ্দশায় এই Zodiac Sign গুলোর কোন বিচ্যুতি অনুভব করতে পারবে না। এই তারকামন্ডলী গুলোর বিচ্যুতি বুঝতে হলে অপেক্ষা করতে হবে ২০০০-৩০০০ বছর। আর যেহেতু জ্যোর্তিশাস্ত্র প্রায় ২৫০০ হাজার বছর পুরানো তাই পুরাতন Horoscopic Calendar এর তারিখ গুলোর সাথে তারকামন্ডলীর অবস্থান এখন আর মেলে না। তবে Astrologist রাও এখন আপডেটেট হচ্ছে। তারা নাসার সাথে মিল রেখেই ১২টি তারকামন্ডলী দিয়েই আপডেটেট ক্যালেন্ডার বানিয়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন Astronomical App ব্যবহার করে। তবে এই তারকমন্ডলী গুলোর বিচ্যুতি কেন ঘটছে সেটা এখন প্রশ্ন? আসলে তারকামন্ডলীর কোন বিচ্যুতি ঘটে না! বিচ্যুতি ঘটে পৃথিবী যে সমতলের উপর উপর লম্বভাবে ঘুরে সেই সমতলের। আমরা আগেই জেনেছি যে এই সমতল পৃথিবীর কক্ষপথের (Ecliptic Circle) উপর উলম্ব রেখার সাথে ২৩.৫ ডিগ্রী কোণে হেলানো। পৃথিবীর আহ্নিক গতি ও বার্ষিক গতি ছাড়াও আরোও একটি গতি আছে সেটাকে বলে প্রিসিশন (Precession)। পৃথিবীর গতি একটি বাঁকা বা হেলানো ভাবে ঘূর্ণায়মান লাটিমের মত তিনটি। লাটিমের নিজস্ব একটা স্পিন থাকে (পৃথিবীর ক্ষেত্রে এটা আহ্নিক গতি), আবার সে নিজে ঘুরতে ঘুরতে একটা বৃত্তাকার পথেও ঘুরে (পৃথিবীর ক্ষেত্রে এটা বার্ষিক গতি)। আর একটি গতি হচ্ছে- লাটিমের মাথা যে পাশে হেলানো থাকে, নিজ অক্ষে ও মাটিতে বৃত্তাকার পথে ঘুরতে ঘুরতে সেই পাশেরও পরিবর্তন হয় (Wobble Motion)। অথাৎ লাটিমের ঝুঁকে পরা মাথাও একটি বৃত্তাকার পথে কখনো পুবে, কখনো পশ্চিমে বা কখনো উত্তর বা দক্ষিণে ঝুঁকতে থাকে। ঠিক সেই রকম পৃথিবীর ঝুঁকে থাকে মেরুদ্বয়ও ২৩.৫ ডিগ্রি কোণে একটি বৃত্তাকার পথে তার হেলানো তলের পরিবর্তন করে। আর এই পরিবর্তন হয় খুব ধীরে। প্রায় ২৫,৭৭০ বছর সময় লাগে পৃথিবীর তার হেলানো পাশ পরিবর্তন করে আবার আগের জায়গায় ফিরে আসতে। পৃথিবীর উপর চাঁদের মহাকর্ষ বলের প্রভাবে এমন্ হয়ে থাকে।

image

আমাদের North Star এর নাম ধ্রুব তারা (Polaris)। যা Ursa Minor (Little Bear) লঘু সপ্তর্ষিমন্ডলের সবচেয়ে উজ্জ্বলতম তারা। বর্তমানে ধ্রুব তারা (Polaris) সোজা উত্তর মেরু বা অক্ষরেখা বরবার অবস্থিত। কিন্তু পৃথিবীর প্রিসিশন গতির কারণে মেরুদ্বয় কক্ষপথের (Ecliptic Circle) উলম্ব রেখার সাথে ২৩.৫ ডিগ্রি কোণে হেলানো ভাবে একটি বৃত্তাকার পথে ২৫,৭০০ বছরে একবার পরিভ্রমণ করে। এই প্রিসিশন গতির কারণে ধ্রুব তারা অনেক আস্তে আস্তে উত্তর মেরু থেকে সরে যায়। তাই ধ্রুব তারা যে আসলে ধ্রুব কথাটি ঠিক নয়। এর ইংরেজি নাম Polaris এটাও আসলে যুক্তিযুক্ত নয় কেননা আজ হতে প্রায় ১২,৮৫০ বছর আগে বরফ যুগে Polaris নয় বরং Vega (অভিজিৎ) ছিল পৃথিবীর North Star। আবার এখন থেকে ১২,৮৫০ বছর পর ১৪,৮৭০ সালে অভিজিৎ (Vega) নক্ষত্র আমাদের উত্তর মেরু নির্দেশ করবে। এই অভিজিৎ (Vega) তারার অবস্থান লিরা (Lyra) তারকামন্ডলীতে। আমরা আগেই জেনেছি যে, পৃথিবীর এই প্রিসিশন গতির কারণেই (Zodiac Cycle) এ অবস্থিত তারকামন্ডলীগুলোর সময়ের সাথে আপেক্ষিক অবস্থানের পরিবর্তন ঘটে। যদিও এই পরিবর্তন বুঝতে আমাদের কয়েকশ বছর অপেক্ষা করতে হয়।

পৃথিবী সূর্যকে উপবৃত্তাকার (Elliptical) পথে পরিভ্রমণ করে এবং উপবৃত্তের উৎকেন্দ্রিকতা (Eccentricity) সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তিত হয়। আমরা জানি বৃত্তের উৎকেন্দ্রিকতার মান শূণ্য। আর পৃথিবীর এই Ecliptic Circle (অয়নবৃত্ত) এর উপবৃত্তাকার পথের উৎকেন্দ্রিকতার (Eccentricity) সর্বোচ্চ মান ০.০৬৭৯ এবং সর্বনিন্ম মান ০.০০০০৫। এর থেকে বোঝা যায় পৃথিবীর Ecliptic Circle (অয়নবৃত্ত) অল্প উপবৃত্তাকার (Elliptical)। ঠিক ভাবে পর্যবেক্ষণ না করলে তা বৃত্তাকারই মনে হয়। পৃথিবীর এই উৎকেন্দ্রিকতার মান সর্বোচ্চ থেকে সর্বনিন্ম হয়ে আবার সর্বোচ্চ হতে সময় লাগে ১০০,০০০ বছর। বর্তমানে পৃথিবীর উৎকেন্দ্রিকতার মান ০.০১৬৭ এবং সর্বনিন্মাভিমুখী। অথাৎ বর্তমানে পৃথিবীর Ecliptic Circle (অয়নবৃত্ত) উপবৃত্তাকার থেকে ধীরে ধীরে বৃত্তাকার (Circular) বা অল্প উপবৃত্তাকার (Elliptical) হচ্ছে।

image

পৃথিবীর এই Ecliptic Circle এর যে বিন্দু সূর্য থেকে সবচেয়ে কাছে থাকে তাকে বলা হয় Perihelion (অনুসূর) আর যে বিন্দু সূর্য থেকে সবচেয়ে দূরে থাকে তাকে বলা হয় Aphelion (অপসূর)। পৃথিবীর অয়নবৃত্তের উৎকেন্দ্রিকতার পরিবর্তন ঘটে মূলত শনি ও বৃহঃস্পতির মহাকর্ষ বলের প্রভাবে।

image

আমরা জানি পৃথিবী ৩৬৫ দিনে একবার সূর্যকে পরিভ্রমণ করে আসলে কথাটি ঠিক নয়। Astronomy এর ভাষায় সৌর বছর দু’টিঃ- একটির নাম Tropical Year, অপরটির নাম Sidereal Year। পৃথিবীর একবার যেকোন Solstice (ক্রান্তীয়)/ Equinox (বিষুবীয়) অবস্থা থেকে কক্ষপথ ঘুরে আবার ঐ একই Solstice (ক্রান্তীয়)/ Equinox (বিষুবীয়) অবস্থায় আসতে যে সময় লাগে তাকে Tropical Year বলা হয়। অনেক সময় একে ব্যাখ্যা করার জন্য এভাবে বলা হয়, পৃথিবীর একবার Vernal Equinox (২১ মার্চ) থেকে নিজ কক্ষপথে ঘুরে আবার Vernal Equinox (২১ মার্চ) এ আসতে যে সময় লাগে তাকে Tropical Year বলে। পৃথিবীর Tropical Year এর সময়কাল ৩৬৫ দিন ০৫ ঘণ্টা ৪৮ মিনিট ৪৭ সেকেন্ড।

বছরের কোন একটি তারিখে কোন এক সময়ে পৃথিবী থেকে সূর্যের দিকে তাকালে সূর্য একটি নির্দিষ্ট তারকামন্ডলীর নির্দিষ্ট একটি স্থানে অবস্থান করে। পৃথিবীর তার নিজ কক্ষপথে ঘুরে বছরান্তে আবার এরুপ দশায় আসতে যে সময় লাগে তাকে Sidereal Year বলে। পৃথিবীর Sidereal Year এর সময়কাল ৩৬৫ দিন ০৬ ঘণ্টা ০৯ মিনিট ১০ সেকেন্ড। তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, Tropical Year এবং Sidereal Year এর মধ্যে সময়ে ব্যবধান প্রায় ২০ মিনিট।

ধরি, কোন একটি বছর ২১ মার্চ বাংলাদেশ সময় ১৫ টা ৪৫ মিনিটে সূর্য পৃথিবীর বিষুব রেখা উপর লম্ব ভাবে আপতিত হল (অয়নবৃত্ত ও বিষুব রেখা পরস্পরকে ছেদ করে) (Vernal equinox) ঠিক এই সময় পৃথিবী থেকে সূর্যের দিকে তাকালে সূর্য Pisces বা মীন তারকামন্ডলের একটি নিদির্ষ্ট স্থানে অবস্থান করছে; পৃথিবীর এখন তার নিজ কক্ষপথে ঘুরে বছররান্তে এই দশায় আসার ২০ মিনিট আগেই অর্থাৎ ১৫ টা ১৫ মিনিটেই (Vernal equinox) এ পৌছে যাবে। প্রতিবছরে ২০ মিনিট করে হলে ৩ বছরে ১ ঘন্টা এবং ৭২ বছরে ১ দিন পিছিয়ে যাবে। এবং দেখা যাবে প্রায় সাড়ে ১২ হাজার বছর পর ২১ মার্চের পরিবর্ততে ২৩ সেপ্টেম্বর Vernal equinox হচ্ছে (বর্তমানে এটি Autumnal Equinox)। তদ্রুপ Summer Solstice Northern ২১ জুনের পরিবর্তে হয়ে যাবে ২১ ডিসেম্বরে। আর Winter Solstice Northern ২১ ডিসেম্বরের পরিবর্তে হয়ে যাবে ২১ জুনে। অর্থাৎ উত্তর গোলার্ধে জূন মাসে শীতকাল এবং ডিসেম্বর মাসে ক্রিসমাসের সময় হবে গরমকাল। তাই এরুপ যাতে না হয় তাই Solstice এবং Equinox এর তারিখগুলোকে ফিক্সড রাখার জন্য ক্যালেন্ডারে প্রতি লিপ ইয়ার ক্যালকুলেশনের সময় এমন একটি শর্ত করা হয়েছে যদি কোন সন ০৪ এবং ১০০ উভয় সংখ্যা দ্বারা ভাগ যায় তাহলে সে সনকে লিপ ইয়ার হতে হলে ৪০০ দ্বারাও ভাগ যেতে হবে। মূলত আমাদের ক্যালেন্ডারকে Tropical Year এর সাথে সামাঞ্জস্য রাখার জন্যেই এমনটি করা হয়েছে। Tropical Year এবং Sidereal Year এর মধ্যে সময়ে ব্যবধান ঘটে মূলত পৃথিবীর প্রিসিশন (Wobble Motion) গতির কারণে সাথে সাথে কক্ষপথের Apsidal Motion এই সময়ের ব্যবধানকে অতি সামান্য হ্রাস-বৃদ্ধি করে। যদিও আমরা ক্যালেন্ডারের তারিখের সামাঞ্জস্য করতে পারি কিন্তু তাই বলে Perihelion বা Aphelion এর সাথে Solstice এবং Equinox গুলোর আপেক্ষিক অবস্থানের পরিবর্তন আমরা ঠেকাতে পারি না। বর্তমানে December Solstice এর দুই সপ্তাহ পর ৩ বা ৪ জানুয়ারি পৃথিবী Perihelion এ অবস্থান করে। কিন্তু ১২৪৫ সালে December Solstice হত পৃথিবি যখন Perihelion এ অবস্থান করত তখন। এখন থেকে আবার প্রায় ১২,০০০ বছর পর December Solstice হবে পৃথিবি যখন Aphelion এ অবস্থান করবে এবং June Solstice হবে যখন পৃথিবী Perihelion এ অবস্থান করবে। যদিও পৃথিবীর Perihelion এবং Aphelion এর অবস্থানের উপর উত্তর ও দক্ষিণ গোলার্ধে ঋতুর পরিবর্তন নির্ভর করে না। কিন্তু এই অবস্থানের উপর ঋতুর তীব্রতা নির্ভর করে। কেপলারে সূত্র মতে যখন পৃথিবী যখন সূর্যের কাছাকাছি (perihelion) অবস্থান করবে তখন সে মহাকর্ষ বলের কারণে তার কক্ষপথের অবস্থান দ্রুত পরিবর্তন করবে এবং যখন দূরে থাকবে (Aphelion) তখন সে কক্ষপথের অবস্থান আস্তে আস্তে পরিবর্তন করে। বাস্তবিক ক্ষেত্রেও তাই হয়।

যেহেতু এখন December Solstice সূর্যের কাছাকাছি বা perihelion এর সময় হয় তাই উত্তর গোলার্ধে শীতকালের সময় কম ও মৃদু শীত অনুভব হয় এবং দক্ষিণ গোলার্ধে গরম কাল ছোট কিন্তু তীব্র হয়। আবার June Solstice এর সময় পৃথিবী Aphelion এ অবস্থান করে তাই সূর্য থেকে দূরে অবস্থানের কারণে এই সময় উত্তর গোলার্ধে গরমকাল দীর্ঘ হয় কিন্তু গরমের তীব্রতা মৃদু হয় এবং দক্ষিণ গোলার্ধে শীতকাল দীর্ঘ হয় কিন্তু শীতের তীব্রতা বেশি থাকে। এজন্য এখন উত্তর মেরুর থেকে দক্ষিণ মেরুতে বরফের পরিমাণ বেশি। এখন থেকে আবার প্রায় ১২,০০০ বছর পর এর উল্টো ঘটনা ঘটবে। অর্থাৎ উত্তর গোলার্ধে সব কিছু তীব্র কিন্তু দীর্ঘ শীতকাল এবং ছোট গরমকাল অপরপক্ষে দক্ষিণ গোলার্ধে সব কিছু মৃদু কিন্তু ছোট শীতকাল এবং দীর্ঘ গরমকাল অনুভুত হবে। এর কারণে উত্তরে বেশি বরফ জমবে এবং দক্ষিণের অধিকাংশ বরফ গলে যাবে। আমাদের পৃথিবী এখন এই পথের দিকেই এগোচ্ছে। যেহেতু অধিকাংশ স্থল বসতি উত্তর গোলার্ধে আর পানির চেয়ে মাটির তাপ ধারণ ক্ষমতা কম তাই ১২,০০০ হাজার বছর পর পৃথিবীতে একটি স্বল্পকালীন (স্থায়ীত্বঃ কয়েক হাজার বছর) বরফ যুগ (Inter-glacial Period) আসবে।

image

এখন ঘূর্ণণ যে শুধু পৃথিবীর হয় বেপারটা তাই নয়। পৃথিবী যে উপবৃত্তাকার পথে সূর্যকে প্রদক্ষিণ Ecliptic Circle (অয়নবৃত্ত) প্রায় ১১২০০০ বছরে একটি নির্দিষ্ট তারকামন্ডলী সাপেক্ষে স্থান পরিবর্তন করে। একে Apsidal Precession বা Perihelion Precession বলা হয়। যেমন ধরা যাক এখন Perihelion হয় ৩ অথবা ৪ জানুয়ারী যখন সূর্য Sagittarius তারকামন্ডলীর একটি নিদির্ষ্ট স্থানে অবস্থান করে। আবার সূর্য Sagittarius তারকামন্ডলীর একটি নিদির্ষ্ট স্থানে অবস্থান করবে তখন Perihelion হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ১১২০০০ বছর। তখন যে জানুয়ারী মাসের ৩ বা ৪ তারিখ হবে তা কিন্তু আবার ঠিক নয়। এই ১১২০০০ বছরের মধ্যে প্রায় শ’ খানেক বার ৩ জানুয়ারীতে Perihelion হবে। কিন্তু Perihelion হওয়ার সময় সূর্য যে ঠিক ঐ নক্ষত্রমন্ডলীর ঐ স্থানে অবস্থান করবে তা ঠিক নয়। কারণ আমাদের ক্যালেন্ডার বানানো হচ্ছে Tropical Year ক্যালকুলেশনের উপর ভিত্তি করে যাতে Solstice ও Equinox গুলোর তারিখ সব সময় ঠিক রাখা হয়। (যদিও সেটাও ঠিক রাখা সম্ভব হয়ে দাঁড়ায় না) Perihelion বা Aphelion এর কোন নিদির্ষ্ট তারিখ নাই। আমরা জানি Solstice ও Equinox গুলোর অবস্থান প্রায় ২৫,৭০০ বছরে Ecliptic Circle এর মধ্যে আবার একই দশায় ফেরত আসে। এটা হয় পৃথিবীর নিজস্ব প্রিসিশন গতি বা Wobble Motion এর কারণে। আমরা আরোও জেনেছি ১২৪৫ সালে Perihelion এর সময় December Solstice হয়েছিল ঠিক তেমনি আবার Perihelion এর সময় December Solstice হতে সময় লাগবে ১২৪৫ সাল থেকে প্রায় ২১,০০০ হাজার বছর ( এখন থেকে ১৩২৫ বছর পরে)। মুলত পৃথিবীর নিজস্ব প্রিসিশন গতি বা Wobble Motion এবং Ecliptic Circle এর Apsidal Precession এর যৌথ কারণে এমনটি ঘটবে। মূলত এই দুই গতির যৌথ কারণে Perihelion এবং Aphelion এর তারিখ প্রতি ৫৮ বছরে ১ দিন পিছিয়ে যায়।
image

আবার পৃথিবীর কক্ষপথের পরিবর্তনশীল উৎকেন্দ্রিকতার জন্য পৃথিবীর একটি নির্দিষ্ট উৎকেন্দ্রিকতার মান থাকে আবার ঐ একই উৎকেন্দ্রিকতার মানে পৌছাতে সময় লাগে প্রায় ১০০,০০০ বছর। আমরা জানি পৃথিবী নিজস্ব ঘূর্ণায়মান মধ্যরেখা তার Ecliptic Circle এর উপর উলম্ব রেখা থেকে ২৩.৫ ডিগ্রি কোণে হেলানো। কিন্তু দেখা যায় এই কোণের মানও পরিবর্তনশীল। এই কোণের মান সর্বোচ্চ ২৪.৫ থেকে সর্বনিন্ম ২১.১ হতে পারে। এই কোণের মান সর্বোচ্চ থেকে সর্বনিন্ম হয়ে আবার সর্বোচ্চ হতে সময় লাগে প্রায় ৪১,০০০ বছর। বর্তমানে পৃথিবী প্রায় ২৩.৪৪ ডিগ্রি কোণে হেলানো। যিশুর জন্মের প্রায় ৮,৭০০ বছর আগে পৃথিবী ২৪.৫ ডিগ্রি কোণে হেলানো ছিল আবার ১১,৮০০ সনের দিকে পৃথিবী সর্বনিন্ম ২১.১ ডিগ্রি কোণে হেলে থাকবে।
image

পৃথিবীর এই ঘূর্ণায়মান মধ্যরেখা কক্ষপথের উপর উলম্ব রেখা থেকে হেলানো থাকে বলেই উত্তর ও দক্ষিণ গোলার্ধে ঋতুর পরিবর্তন হয়। তাই যখন পৃথিবী যখন বেশী হেলে থাকবে তখন ঋতু পরিবর্তনের তীব্রতা বেশি থাকবে অর্থাৎ গরমকালে বেশী গরম এবং শীতকালে বেশী শীত অনুভুত হবে। আবার যখন কম হেলে থাকবে তখন তখন ঋতু পরিবর্তনের তীব্রতা কম থাকবে। পৃথিবীর এই হেলে থাকা তলের কোণের পরিবর্তনের কারণেই বরফ যুগের শুরু ও সমাপ্তি নির্ভর করে। বরফ যুগকে আবার দুই ভাবে ভাগ করা যেতে পারে। একটি হলঃ Inter-glacial period (স্বল্পকালীন বরফ যুগ) এবং অন্যটি হল Glacial Period (দীর্ঘকালীন বরফযুগ)। একটি Glacial Period এর ভেতরে অনেক গুলো Inter-glacial period থাকে। বর্তমানে আমরা যে সময়টাতে আছি সেটা হল একটি Glacial Period এর শেষের দিকের Inter-glacial period এর শেষ পর্যায়ে। মুলত পৃথিবীর প্রিসিশন গতি এবং পৃথিবীর হেলানো তলের পরিবর্তনের কারণেই Inter-glacial period গুলো তৈরি হয় আর পৃথিবীর উৎকেন্দ্রিকতার পরিবর্তনের কারণে তৈরি হয় Glacial Period এর। শুধুমাত্র Apsidal Precession Motion ছাড়া সব গুলো গতি নিউটনের গতি আর মহাকর্ষ সূত্রে মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা যায়। আইন্সটাইন বুধের Apsidal Precession Motion কে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আপেক্ষিকতার থিউরি প্রদান করেছিলেন।

প্রাচীন কালে মানুষেরা রাতের আকাশকে ঘড়ি ও কম্পাস হিসেবে ব্যবহার করতে পারত। শুধু তাই নয় তারাদেরও একটা ভাষা আছে, খালি চোখে উনারা এই ভাষা পড়তে পারত। তারাদের গতি প্রকৃতি দেখে মহামারি, দূর্যোগের পূর্বাভাস বের করতে পারত। বর্তমানে আমরা কিছুই চিনি না। মাথার উপরের তারা গুলো যে কথা বলতে পারে সেই ভাষা খালি চোখে, হাতের আংগুলে গুণে বের করার দক্ষতা এখন আর আমাদের নেই। তাই খালি চোখে লুব্ধক, ধ্রুব, অভিজিৎ, কালপুরুষ কোনটিই আমাদের চোখে ধরা দেয় না।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top